বাড়ছে শিশু ধর্ষণের হার : প্রয়োজন অভিভাবকদের সতর্কতা

0

নিজের ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতাও হয়ে উঠেনি। অথচ এমন অপরিণত বয়সে ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে শিশুদের। এরপর সমাজের ‘কলঙ্কে’র ঘানি টেনে বেড়ে উঠতে হচ্ছে দিনের পর দিন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নারীর পাশাপাশি শিশু ধর্ষণের হারও অশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ধর্ষণের ঘটনা থেকে বিকৃত মানসিকতার পরিচয় ফুটে উঠলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অভাবে এই অপরাধ বাড়ছে বলে দাবি অভিভাবকদের। তবে শিশুদের লালন-পালনে অভিভাবকদের যুগোপযোগী মনোভাবের অভাবের কারণেও এ অপরাধ দমন সম্ভব হয়ে উঠছেনা বলে পাল্টা দাবি আইন ও শিশু বিশেষজ্ঞদের।

শিশু অধিকার ফোরামের গত বছর থেকে চলতি বছরের প্রথম চার মাস পর্যন্ত করা একটি প্রতিবেদন দেখা যায়, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন বেড়েছে ২২৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৫ সালে মোট ৫২১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ৯৯ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়। ৩০ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ধর্ষণের শিকার ৪ শিশু আত্মহত্যা করে। ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার হওয়া ১৯৯ শিশুর মধ্যে ২২ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের শিশু ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. জাহানার সুমীর মতে, পরিবারকেই আগে শিশুর সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবারের কাছ থেকে শিশুরা সবকিছু সহজে শিখতে পারে। শিশুদেরকে যত্রতত্র যার তার কোলে বা কাছে না দিয়ে নিজেকে সামলাতে হবে।শিশুর গতিবিধি বাবা-মাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সর্বোপরি শিশুর যত্নে এবং রক্ষণাবেক্ষণে পরনির্ভরশীল হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

শিশুর লালন-পালনের কিছু কৌশল সম্পর্কে প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া তাহসিন আনজুমের মা রওশন আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে একই ক্লাসে ছেলে শিশুরাও ক্লাস করে। এইটুকু বয়সে ওকে (তাসিন আনজুমের বন্ধু) এক ছেলে বিয়ের কথা বলেছে। বাসায় এসে মেয়ের সঙ্গে স্কুলের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনাকালে মেয়ে জানতে চাইলো ‘বিয়ে কি মা?’ তারপর সব জানতে পেরে বিগড়ে না গিয়ে মেয়েকে বোঝালাম। মেয়েকে তার শরীরের স্পর্শকাতর স্থানগুলোর কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন নাম শেখালাম। যেমন- মিনি, টোটন, লকি ইত্যাদি। মেয়েকে এটাও শিখিয়েছি, তোমার শরীরের এই জায়গাগুলোতে চাচা, মামা, খালু, নানা-দাদা, বন্ধু বা পরিচিত-অপরিচিত কেউ হাত দিলে তুমি জোরে চিৎকার দিয়ে উঠবে। তাই আমি মনে করি, এভাবে সব অভিভাবকের সচেতন হওয়াটা এখন খুব জরুরি।’

অন্যদিকে জান্নাতুল ফেরদৌস নামে রাজধানীর আরেক গৃহিণী বলছেন, ‘দেশে ধর্ষণের মত ভয়াবহ অপরাধের বিচার দৃশ্যমান নয়। এই বিচার দৃশ্যমান হলেই এই ঘৃণিত অপরাধ সম্পর্কে সবার ভীতি সৃষ্টি হবে। এজন্য রাষ্ট্র, আইনজ্ঞদের এগিয়ে আসতে হবে। আইনের সুপ্রতিষ্ঠা ছাড়া এইসব ঘটনা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।

সম্প্রতি প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলাকে ধর্ষণের মত ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নিষ্ঠুর উপায়ে তার প্রাণটিও কেড়ে নেয়া হয়েছে।

তানজিলা রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার দুরামিথিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা একজন কৃষক। তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে তানজিলা ছিল সবার ছোট। গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে তানজিলার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে শুক্রবার দুপুরে পীরগঞ্জ থানার পুলিশ রামনাথপুর ইউনিয়নের প্রধানপাড়া গ্রামের আবদুল মোমিনের বাড়ি থেকে ওই লাশ উদ্ধার করে। আবদুল মোমিনের ছেলে রিয়াদ (১৮) শিশু তানজিলাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখে। পরে পুলিশ রিয়াদকে আটক করে।

রিয়াদ পুলিশের কাছে জানিয়েছেন, শিশুটি ঘটনা ফাঁস করে দিতে পারে—এই ভয়ে রিয়াদ তার গলায় দড়ি প্যাঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে।

তবে বাংলাদেশে তানজিলাই প্রথম শিশু নয়, যাকে এমন পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। অতীতে অনেক মেয়ে শিশুই এমন ঘটনার শিকার হয়েছে।

গত মে মাসে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের শিবনাথপুর গ্রামে রিতু খাতুন নামে একটি শিশুকেও ধর্ষণ করার পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। রিতুর বয়সও ছিলো সাত বছর।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দক্ষিণখান এলাকায় সাদিয়া আফরিন নামে ৮ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। প্রতিবেশীর বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে হাত, পা ও গলায় রশি বাঁধা অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। চলতি জুন মাসে বাগেরহাটের চিতলমারীতে জাকিয়া সুলতানা নামে ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

প্রতিনিয়ত এ রকম অহরহ ঘটনা ঘটে চলেছে। অথচ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ আইনের (সংশোধনী ২০০৩) ৯ (১) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে, তাহলে তার শাস্তি হবে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ড। এই আইনের ৯ (২) ধারায় ধর্ষণের কারণে ধর্ষিতার মৃত্যু হলে ধর্ষকের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লাখ টাকার অর্থদণ্ড। এই আইনের ৯ (৩) ধারায় গণধর্ষণের শাস্তি প্রত্যেক ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লাখ টাকার অর্থদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিচার হলেই অপরাধ কমে যায় না। আমাদের সমাজ-ব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটালাইজেশান হওয়ায় এর বিরুপ প্রভাব পড়ছে সমাজে। সময় এসেছে ডিজিটালাইজড পদ্ধতিগুলোকে গবেষণা করে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আমাদের শিশু-কিশোরেরা ফিল্ম, পর্নোগ্রাফি দেখে ওই অনুসারে চলতে চায়। যেহেতু হাইকোর্টে শিশুদের বিচার আলাদা এবং দ্রুত করার নির্দেশনা রয়েছে সেহেতু আইন প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন না তুলে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার স্পর্শকাতর দিকগুলো নিয়ে এখনি ভাবতে হবে।’

Share.